রাফি হত্যার ঘটনায় ওসিকে আসামি না করায় বাদীপক্ষের প্রশ্ন:উত্তরবঙ্গ প্রতিদিন

উত্তরবঙ্গ প্রতিদিনে প্রকাশিত সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেনী প্রতিনিধি ,উত্তরবঙ্গ প্রতিদিন::সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মোট ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে পিবিআই। গতকাল দুপুরে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম (সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) (আমলি আদালত সোনাগাজী) মো. জাকির হোসেনের আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. শাহ আলম। ওদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহাজান সাজু বলেন, অভিযোগপত্রের শুনানির দিন ওসিকে কেন আসামী করা হয়নি তা জানতে চাওয়া হবে। প্রয়োজনে অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি জানাবেন।
পিবিআই চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল জানান, পিবিআই মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার ৫০ দিনের মধ্যে ৩৩ কার্যদিবসে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। ৮০৮ পৃষ্ঠার এ অভিযোগপত্রে ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় সরাসরি জড়িত পাঁচজনসহ মোট ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই মাদরাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন এবং সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম ওই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে আর্থিক সহযোগিতাসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পিবিআই চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল আরো জানান, অভিযোগপত্রে ৯২ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এদের মধ্যে কার্যবিধির ১৬১ ধারায় ৬৯ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৭ জন সাক্ষী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিমূলক সাক্ষ্য দিয়েছেন। আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রের সারমর্ম বিচারকের কাছে তুলে ধরেন। হত্যার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, হত্যার সময়কালীন ঘটনার ডিজিটাল স্কেচও আদালতে তুলে ধরেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল জানান, নুসরাত জাহান রাফিকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা এবং হত্যার পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ ও হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৪ (১) ও ৩০ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পিবিআই অভিযোগপত্রে ১৬ আসামির সবার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে।

এদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু জানান, পিবিআই আদালতে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করার পর ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসেন অভিযোগপত্রটি সিন (দেখেন) করেন। আজ ৩০শে মে মামলার নিয়মিত ধার্যদিন থাকায় অভিযোগপত্রের ওপর শুনানি হবে বলে বিচারক উপস্থিত আইনজীবীদের জানিয়েছেন।

আইনজীবী শাহাজান সাজু আরো জানান, মামলার ধারা অনুযায়ী মামলাটির বিচারকাজ চলবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। সেক্ষেত্রে আমলি আদালত থেকে মামলাটি ওই ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে হবে। এরপর মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের ওপর শুনানি হবে।

তিনি আরো জানান, পিবিআই’র অভিযোগপত্রে সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে আসামি করা হয়নি। এই ওসি প্রথম থেকে হত্যার ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে প্রচারণা চালায়। মামলার অভিযোগপত্রে ওসিকে কেন আসামি করা হয়নি অভিযোগপত্রের শুনানির দিন আইনজীবীরা পিবিআইর কাছে জানতে চাইবেন। প্রয়োজনে আইনজীবীরা মামলার বাদী নুসরাতের ভাই নোমানের সঙ্গে আলাপ করে অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি জানাবেন।

মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, ‘পিবিআই আদালতে যে অভিযোগপত্রটি দিয়েছে তার বিস্তারিত আমার এই মুহূর্তে জানা নেই। আমি দেখবো অভিযোগপত্রে কারা কারা আসামি হয়েছেন। তবে আমি মনে করি আমার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে এ মামলায় অভিযোগপত্রে আসামি করা উচিত ছিল। আমি আমার আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো’।

নুসরাতের মা শিরীন আক্তার বলেন, ‘মামলার পর থেকে অনেক ধরনের হুমকি পেয়েছি। তবে আমরা এটাকে আমলে নেইনি। যেখানে মেয়েকে হারিয়েছি, সেখানে নিজেরা বেঁচে থেকে কী করবো। যেখানে নুসরাত হত্যার বিচারের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়েছেন, সেখানে আমাদের মেরে ফেললেও কোনো সমস্যা নেই। মামলার অভিযোগপত্রে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, কাউন্সিলর মাকছুদ আলমসহ ১৬ জনকে অভিযুক্ত করায় আমরা সন্তোষ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে আমরা আদালতের কাছে সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি’।

অভিযোগপত্রে আসামিরা হলেন: সোনাগাজীর চরকৃষ্ণজয়ের কলিম উল্যাহ সওদাগর বাড়ির কলিম উল্যার ছেলে এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মো. আহসান উল্যাহর ছেলে নুর উদ্দিন (২০), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূঁইয়া বাজার এলাকার নবাব আলী টেন্ডল বাড়ির মো. আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক) ও চরগণেশ গ্রামের পাণ্ডব বাড়ির আহসান উল্যাহ’র ছেলে মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ আল কাউন্সিলর (৫০), পূর্ব তুলাতলী গ্রামের খায়েজ আহাম্মদ মোল্লা বাড়ির আবুল বাশারের পুত্র সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের সৈয়দ সালেহ আহাম্মদের বাড়ির রহমত উল্যাহ ছেলে জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ (১৯), সফরপুর গ্রামের খান বাড়ির আবুল কাশেমের ছেলে হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ও উত্তর চারচান্দিয়া গ্রামের সওদাগর বাড়ির ইবাদুল হকের ছেলে আবছার উদ্দিন (৩৩), চরগণেশ গ্রামের আজিজ বিডিআর বাড়ির আব্দুল আজিজের (পালক বাবা) মেয়ে কামরুন নাহার মণি (১৯), লক্ষ্মীপুর গ্রামের সফর আলী সর্দার বাড়ির শহিদুল ইসলামের মেয়ে উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা (১৯), পূর্ব চরচান্দিয়া গ্রামের সোজা মিয়া চৌকিদার বাড়ির আব্দুল শুক্কুরের ছেলে আব্দুর রহিম শরীফ (২০), চরগণেশ গ্রামের হাজী ইমান আলীর বাড়ি ওরফে মালশা বাড়ির জামাল উদ্দিন জামালের ছেলে ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), চরগণেশ গ্রামের এনামুল হকের নতুন বাড়ির এনামুল হক ওরফে মফিজুল হকের ছেলে ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), তুলাতলী গ্রামের আলী জমাদ্দার বাড়ির সফি উল্যাহর ছেলে মোহাম্মদ শামীম (২০), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চরচান্দিয়া গ্রামের ভূঁইয়া বাজার এলাকার কোরবান আলীর বাড়ির কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন (৫৫), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের বোর্ড অফিস সংলগ্ন রুহুল আমিনের নতুন বাড়ির মো. রুহুল আমিনের ছেলে মহিউদ্দিন শাকিল (২০)।

গত ৬ই এপ্রিল সকালে নুসরাত জাহান রাফি আলিমের আরবি (প্রথমপত্র) পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে দুর্বৃত্তরা কৌশলে তাকে মাদরাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নিয়ে যায়। পরে তাকে বোরকা পরা দুর্বৃত্তরা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। এ সময় নুসরাত মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানালে দুর্বৃত্তরা তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ দিন পর গত ১০ই এপ্রিল রাতে মারা যায়। পরদিন ১১ই এপ্রিল বিকালে তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ- দৌলাকে প্রধান আসামি করে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৪/৫ জনকে আসামি করে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান গত ৮ই এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। দুইদিন পর ১০ই এপ্রিল মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই)। ওই মামলায় এজাহারনামীয় ৮ জনসহ ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। এদের মধ্যে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১২ জন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।


উত্তরবঙ্গ প্রতিদিনে প্রকাশিত সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •