দেশের তাপদাহ বা উত্তাপ দ্বীপ সৃষ্টি

দেশের তাপদাহ বা উত্তাপ দ্বীপ সৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্র থেকে -ডঃ এম. এম. আদেল

সম্প্রতি রাজশাহী শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের ঊর্ধে উঠার খবর এসেছে গণসংযোগ মাধ্যমে। আবহাওয়া অফিস শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাষই দিয়ে থাকে। বৈরীতার কারণ তলায়ে দেখে না। জানলেও তা জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করে থাকে না।

উত্তাপ বৃদ্ধির কথা গোড়া থেকেই শুরু করা যাক। তাপ ক্যলরিতে মাপা হয়ে থাকে। এক ক্যালরি হচ্ছে এক গ্রাম পানির তাপমাত্রা এক ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বাড়াতে যে পরিমাণ তাপ লাগে। এক কিলোগ্রাম বিভিন্ন পদার্থের এক ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে কি পরিমাণ তাপ প্রয়োজন তা ক্যালরিতে নীচের ছকে দেওয়া হয়েছে। দেখা যায় যে এ্যাসফল্ট ও কংক্রিট পানির তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ জলদি গরম হতে পারে। ইটও ঐ রকম জলদি গরম হয়ে উঠে। টিন এদের থেকে সামান্য কম সময় নিয়ে থাকে – প্রায় সাড়ে চার গুণ জলদি। এই পদার্থগুলো গরম হলে পরিবেশে তাপ বিকিরণ করে থাকে। এরা তাপ প্রতিফলনও করে থাকে।

শহরাঞ্চলে “ইটের পরে ইট, আর মাঝে মানুষ কীট”। আর রয়েছে ধূলাবালি ও যানবাহনের নিঃশেষিত গ্যাস। শহরে স্বল্প পরিসরে অধিকসংখ্যক লোক বাস করে থাকে। শহরগুলোতে ঝাপটা হাওয়া এসে প্রাকৃতিক উপায়ে বদ্ধ বাতাসকে ঠেলে বের করে দিবে এমন অবস্থা অচীন্তনীয়।

বলতে গেলে বাংলাদেশের সব শহরই নদীর তীরে অবস্থিত। দিনের বেলায় স্থলভাগ জলভাগ অপেক্ষা পাঁচগুণ তাড়াতাড়ি গরম হয়ে উঠার দরুণ স্থলভাগের উপরের বায়ু গরম ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় আর জলভাগ থেকে ঠান্ডা বাতাস স্থলভাগের উপর বয়ে আসে। জলভাগ যেমন ধীরে ধীরে গরম হয় তেমনি ধীরে ধীরে ঠান্ডাও হয়। স্থলভাগ জলদি গরম হয় আবার জলদি ঠান্ডাও হয়। রাতের বেলায় স্থলভাগ যখন ঠান্ডা হয়ে যায় জলভাগ তখন গরম থাকে। জলভাগের গরম হালকা বাতাস উপরে যায় আর স্থলভাগ থেকে ঠান্ডা বাতাস জলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। এই স্থল থেকে জলে আর জল থেকে স্থলে বায়ু প্রবাহ জল ও স্থলের সাধারণ সীমানায় ভালভাবে অনুভব করা যায়।

পদার্থ কেজিপ্রতি এক ডিগ্রী বাড়াতে উত্তপ্তের দ্রুততা
পানি ১০০০ ক্যালরি ১.০
মাটি ১৮১০ ক্যালরি ২.৩
এ্যাসফল্ট ২০৯ ক্যালরি ৪.৭
হাড় ১০৫ ক্যালরি ৯.৫
পিতল ২০৯ ক্যালরি ৪.৮
ইট ২০০ ক্যালরি ৫.০
ঢালাই লোহা ১৩২ ক্যালরি ৭.৬
আঠালো মাটি ২০৯ ক্যালরি ৪.৮
কয়লা ৩০০ ক্যালরি ৩.৩
কংক্রিট ২০৯ ক্যালরি ৪.৭
কাঁচ ৭৯২ ক্যালরি ১.৩
লোহা ১১০ ক্যালরি ৯.১
ওক কাঠ ৫৬৭ ক্যালরি ১.৭
রাবার ৪৭৭ ক্যালরি ২.১
বালি ১৮৬ ক্যালরি ৫.৪
টিন ২২৭ ক্যালরি ৪.৪

https://theengineeringmindset.com/specific-heat-capacity-of-materials/

১ নং চিত্র। রাজশাহীর পদ্মার দুরাবস্থা
http://donnybangla.blogspot.com/search/label/Rajshahi%20University

শহরের আলোতে রাতের বেলায় আকাশের দিকে চাইলে ধূলাবালি ভাসতে দেখা যায়। এই ধূলাবালি দিনের বেলায়ও শহরের আকাশে ভেসে থাকে। এই ধূলাবালির স্তর তাপকে নীচে প্রতিফলন করে থাকে। ফলে উত্তাপ শক্তি এই স্তর ভেদ করে উপরের আকাশে উঠতে পারে না। এই আটকে রাখা তাপ শহরকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
শহর জনাধিক্য হয়ে থাকে। প্রতিটা পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তি প্রতি সেকেন্ডে নড়াচড়া না করা অবস্থায় কমপক্ষে ২৫ ক্যালরি তাপ বিকিরণ করে থাকে। ২০২০ সালে মেট্রেপলিটান রাজশাহীর জনসংখ্যা হচ্ছে ৯০৮,০০০। ধরা যাক সবাই পূর্ণবয়স্ক। তাহলে প্রতি সেকেন্ডে শুধু জনগণই ২২,৭০০,০০০ ক্যালরি তাপ ছড়াচ্ছে। ২৪ ঘন্টায় ৮৬,৪০০ সেকেন্ড থাকে। আর সেই সময়ে তাপ বিচ্ছুরিত হয়ে থাকে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ক্যালরি।

প্রতিবেশীর কয়েক দশকের জলদস্যুতা দেশের পানি সম্পদকে সর্বসান্ত করে তুলেছে। ভূ-গর্ভের পানির স্তর অনেক নীচে নেমেছে। ২০/৩০ ফুটের জায়গায় টিউব অয়েল এখন পানি উঠায় ২৪০/২৫০ ফুট নীচে থেকে। ভুপৃষ্ঠের প্রধান প্রধান জলাধারের মধ্যে পদ্মাসহ তার শাখা-প্রশাখা নদী (চিত্র নং ১, ২, ৩ ও ৪) বলতে গেলে এখন পানিশূণ্য খালে কিংবা বিলে পরিণত হয়েছে। ৫ নং চিত্র ভূ-গর্ভস্থ পানি নিঃশেষের প্রবণতা দেখায়।
দেশী বৃক্ষাদি উজাড় করে বিদেশী বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোতে দেশী পাখীরা বাসা বাধঁতে জানে না। মৌমাছিরা ভরসা করে মৌচাক বানাতে পারে না। বিদেশী ইউক্যালিপটাস বৃক্ষ ভূ-গর্ভস্থ পানি উজাড়ে সাহায্য করে। রাজশাহীতে পদ্মার বাঁধে ও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এই বৃক্ষ রোপন করা ছিল। এখনও হয়তো আছে।

২ ন চিত্র। পদ্মার প্রথম শাখা বড়াল নদীর অবস্থা। (সোনালী সংবাদ)

৩ নং চিত্র। বড়ালের শাখা মুছা খাঁর দুরবস্থা

৪ নং চিত্র। মুছা খাঁর শাখা হোজা নদী একন একটা পূনর্খননকৃত খাল

৫ নং চিত্র। ভূ-গর্ভস্থ পানি উজাড়ের চিত্র।

৬ নং চিত্র। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সংগে জনগণের অনুভূতি।

শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি জনজীবন অতিষ্ঠ করতে পারে না। তাপমাত্রার সংগে আর্দ্রতা যোগ হয়ে বিরক্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। জলদস্যুতাপূর্ব গ্রীষ্মকালীন উচ্চতম তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। জলদস্যুতাকালীন সেই তাপমাত্রা হয়েছে ৪৩ ডিগ্রী সেলসিয়াসের উর্ধ্বে। জলদস্যুতাপূর্ব কালে ৫০% জন লোক শূণ্য থেকে ২০% আর্দ্রতায় অনারাম বোধ করতো। সবাই অনারাম বোধ করতো ২০% থেকে ৪০% আর্দ্রতায়। বিশেষ অবসাদগ্রস্ততা বোধ করতো ৪০ থেকে ৮০% আর্দ্রতায়। চরম অবসাদ ও হীট স্ট্রোক অনুভব করতো ৮০ থেকে ১০০ আর্দ্রতায়।

জলদস্যুতাকালীন সময়ে পরিবেশের অনেক অবনতি ঘটেছে। এখন প্রত্যেকে শূণ্য থেকে ১৮% আর্দ্রতায় অনারাম বোধ করতো। বিশেষ অবসাদগ্রস্ততা বোধ করে ১৮ থেকে ৪৮% আর্দ্রতায়। চরম অবসাদ ও হীট স্ট্রোক অনুভব করতো ৪৮ থেকে ৮০% আর্দ্রতায়।

শহরাঞ্চলের এই উত্তপ্তাকে উত্তাপ দ্বীপ সৃষ্টি বলা হয়ে থাকে। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশেষে এই উত্তাপ দ্বীপ শহরের এক বা একাধিক অঞ্চলে সুষ্টি হতে পারে। শহরের বাইরেও সৃষ্টি হতে পারে। খবরে প্রকাশ গরম হাওয়ায় কোন জায়গার ধান পুড়ে গেছে। আবার কোথা্য়ও চা বগান পুড়ে গেছে।

সবকিছু বিবেচনায় দেখা যায় যে জলশূণ্যতাই পরিবেশে উত্তাপ বৃদ্ধির কারণ। পরিষ্কার পানি শুধু ১০% তাপ প্রতিফলন করে থাকে আর ৯০%ই শোষণ করে থকে। পানি তাপ জমা রাখার ভান্ডার হিসাবে কাজ করে থাকে। ভেজা মাটি খুব বেশী হলে ২০% তাপ প্রতিফলন করে। ধানগাছের ডাটা ৪০% অধিক তাপ প্রতিফলন করে থাকে আর ৬০% এর কম শোষণ করে থাকে। সবুজ শষ্য ৩০% তাপ প্রতিফলন করে থাকে।

যে স্থান পানি আটকে রেখে উত্তাপ জমা রাখবে গ্রীষ্মে শীতে পরিবেশে ছাড়ার জন্য আজ ঐ সমস্ত স্থানের ভূমিকা ১৮০ ডিগ্রী বদলে গেছে। ঐ সব বিশাল বিশাল স্থান পানির চেয়ে দ্বিগুণেরও অধিক দ্রুততর সময়ে গরম হয়ে উঠছে আর তা পরিবেশকে দিয়ে থাকছে। এটা শুধূ রাজশাহী অঞ্চলের চিত্র না, উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের চিত্র। গোটা উত্তর-পশ্চিমাংশে কমপক্ষে ১৮ মিলিয়ন ট্রিলিয়ন ক্যালরি তাপ শুধু পানি না থাকার জন্য পরিবেশকে উত্তপ্ত করে থাকে। এই তাপের আশ্রয়স্থল পানি থাকলে জনজীবনকে এমন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারতো না।

দেশের সরকারী বুদ্ধিজীবিরা শুধু সরকারের প্রশংসাই করেন আর দেশের পরিবেশটাকে রসাতলে ঠেলছেন। “সৌভাগ্য রাজার বিজ্ঞের দ্বারে আর দুর্ভাগ্য বিজ্ঞ রাজার দ্বারে” -মওলানা রুমী।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে -ডঃ এম. এম. আদেল
যুক্তরাষ্ট্র থেকে -ডঃ এম. এম. আদেল

Miah Adel, Ph.D.
Professor of Physics, Astronomy, Water Resources, & Environmental Sciences
University of Arkansas at Pine Bluff

Executive Vice President
Humane Water:  An International Charitable Water Purification 
& Technology Transferring Organization
সংবাদটি শেয়ার করুন-
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।