কানাডা

কানাডার আবাসিক স্কুলভবন থেকে ২১৫ জন শিশুর মরদেহ উদ্ধার আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক রিপোর্ট । উত্তরবঙ্গ প্রতিদিন – কানাডার একটি পরিত্যক্ত আবাসিক স্কুলভবন থেকে ২১৫ জন আদিবাসী শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। শুক্রবার কানাডার গণমাধ্যমে এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছেন। যে শিশুদের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে তারা সবাই কানাডার কামলুপস এলকার রেড ইন্ডিয়ান টিকেমলুপস টে সেকওয়েপেমেক গোত্রভূক্ত। উদ্ধার হওয়া এই দেহাবশেষগুলোর মধ্যে তিন বছর বয়সী শিশুদের দেহাবশেষও আছে।

গোত্রটির বর্তমান প্রধান রোসান্নে ক্যাসিমির জানিয়েছেন, কামলুপসের যে স্কুলটি থেকে এই দেহাবশেষগুলো উদ্ধার করা হয়েছে সে স্কুলটিতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ১০০ জন। ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্কুলটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ক্যাথলিক খ্রিস্টান মিশনারিরা। তারপর কামলুপসের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এর প্রায় ১০ বছর পর ১৯৭৮ সালে স্কুলটি বন্ধ করে দেয়া হয়।

শুক্রবার এক বিবৃতিতে ক্যাসিমির জানান, ‘মৃতদের মধ্যে ৩ বছর বয়সী শিশুদেরও মরদেহ পাওয়া গেছে। এটা এমন এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যা কল্পনা করতেও গা শিউরে ওঠে; এবং আরো দুঃখজনক হলো এ ধরনের নিপীড়নের ঘটনা কোথাও লিপিবদ্ধ হয়নি।’

কানাডায় অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে উনবিংশ শতকের শুরুর দিকে দলে দলে ইউরোপীয় বসতকাররা (সেটলার) আসতে থাকে তখন স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ান গোত্রগুলোর সঙ্গে তাদের বেশ কিছু সংঘাত হয়েছিল। ইউরোপীয় বসতকারদের হাতে উন্নত অস্ত্র ও প্রযুক্তি থাকায় সবগুলো সংঘাতেই শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল রেড ইন্ডিয়ানদের।

পরাজিত এই রেড ইন্ডিয়ানদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তকরণ ও ‘অধিকতর সভ্য’ করে তুলতে উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে কানাডাজুড়ে বিভিন্ন আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা শুরু করে ইউরোপীয় সেটলাররা।

প্রায় দেড় লক্ষাধিক রেড ইন্ডিয়ান, ইনুইট ও মেটিস জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জোর-জবরদস্তি করে ১৩৯টি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তি হওয়া শিশুদেরকে ব্যাপকভাবে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

কানাডার আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালে জানায়, উনবিংশ শতকের শুরুরদিকে দেশটিতে ইউরোপীয় সেটলাররা বসতি স্থাপনের পরবর্তী ১০০ বছরে এই আবাসিক স্কুলগুলোতে মারা গেছে ৩ হাজার দুই শতের অধিক শিশু এবং এদের প্রত্যেকেরই মৃত্যুর কারণ খ্যাদ্যাভাব জনিত কারণে অপুষ্টি, প্রহার ও শারীরিক নির্যাতন এবং ধর্ষণ।

স্থানীয় আদিবাসীদের নির্যাতনের জন্য ২০০৮ সালে ক্ষমা চেয়েছিল কানাডার সরকার। তবে গত এক শতাব্দিতে দেশটির আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, এমনটি বলার উপায় নেই।কানাডার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলো এখনও দারিদ্র, বেকারত্ব, পারিবারিক ও গোষ্ঠিগত সহিংসতা ও উচ্চ মাত্রায় আত্মহত্যা প্রবণতার মতো সমস্যায় ধুঁকছে।

এক টুইট বার্তায় জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘কামলুপসে শিশুদের দেহাবশেষ উদ্ধারের সংবাদে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। আমাদের দেশের ইতিহাসের অন্ধকার ও লজ্জাজনক অধ্যায়ের একটি নমুনা এই ঘটনা। আমার ধারণা এই দেশের বেশিরভাগ মানুষের মানসিক অবস্থাও এখন আমার মতোই। আমরা সবসময় দেশের আদিবাসীদের পাশে আছি।’

পঞ্চদশ শতকে স্পেনীয় অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে আমেরিকায় পৌঁছে ভুলক্রমে ভেবেছিলেন তিনি ভারতে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের গায়ের রঙে লালচে ভাব থাকায় তাদেরকে তিনি ‘ইন্ডিয়ান’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সেই থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় আদিবাসীদের ‘রেড ইন্ডিয়ান’ জাতি নামেই চিনে আসছে বিশ্ববাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন-
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।